কর প্রদানের সামর্থ্য নীতি (Ability to Pay Principle) হলো কর ধার্য করার একটি মৌলিক ধারণা, যা অনুযায়ী, করদাতাকে তার আর্থিক সক্ষমতা বা আয় অনুযায়ী কর প্রদান করতে হবে। এই নীতি অনুযায়ী, যাদের আয়ের বা সম্পদের পরিমাণ বেশি, তাদের উপর বেশি কর আরোপ করা হয়, আর যাদের কম আয়ের বা সম্পদের পরিমাণ কম, তাদের কম কর দিতে হয়। এর উদ্দেশ্য হলো আয়ের এবং সম্পদের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো।
কর প্রদানের সামর্থ্য নীতির মূল বিষয়:
1. আয়ের ভিত্তিতে কর ধার্যকরণ:
- এই নীতির ভিত্তি হলো যে, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যতটা আয় করে, তার কর পরিশোধ করার সামর্থ্য ততটাই বেশি থাকে।
- উদাহরণস্বরূপ, একটি ব্যক্তির যদি বছরে ১০ লাখ টাকা আয় হয়, তবে তার করের পরিমাণ হবে সেই তুলনায় বেশি, যিনি বছরে ২ লাখ টাকা আয় করেন। এটি আয়ের ভিত্তিতে কর ধার্য করার মূল ধারণা।
2. প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা:
- এই নীতি অনুসরণ করলে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মানে হলো, যারা বেশি আয় করেন, তাদের ওপর উচ্চ করের হার প্রযোজ্য হয়।
- যেমন, করের হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম ৫ লাখ টাকার আয়কে এক ধরনের কর হার, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার আয়কে অন্য ধরনের কর হার দ্বারা কর করা হতে পারে।
3. সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা:
- কর প্রদানের সামর্থ্য নীতি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এতে ধনী ও গরিবের মধ্যে আর্থিক পার্থক্য কমানোর চেষ্টা করা হয়।
- এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি সুবিচার এবং সমতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
4. করদাতার আর্থিক অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া:
- এই নীতির অধীনে কর আদায়কারী কর্তৃপক্ষ ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থান বা সক্ষমতা বিবেচনা করে কর ধার্য করে। এই পদ্ধতি করদাতাদের চাপ কমাতে সহায়তা করে এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক স্বাধীনতা বজায় রাখে।
5. অভ্যন্তরীণ বৈষম্য কমানো:
- সাধারণত এই নীতির লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য কমানো। এটি নিশ্চিত করে যে, উচ্চ আয়ের লোকেরা সরকারী সেবা থেকে আরও বেশি সুবিধা লাভ করলেও তাদের বেশি কর প্রদান করা উচিত। একইভাবে, কম আয়ের মানুষের ওপর কম কর চাপানো হয়।
কর প্রদানের সামর্থ্য নীতির সুবিধা:
1. সমতা সৃষ্টি:
- আয়ের উপর ভিত্তি করে কর ধার্য করায় সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। উচ্চ আয়ের লোকেরা বেশি কর প্রদান করার মাধ্যমে তারা সমাজের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারেন, আর কম আয়ের লোকেরা কম কর দিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম হন।
2. রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ:
- উচ্চ আয়ের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি কর আদায় করার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। এই রাজস্ব সরকার বিভিন্ন সামাজিক সেবা (যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি) প্রদান করতে ব্যবহার করতে পারে।
3. সামাজিক কল্যাণ বৃদ্ধি:
- এই নীতির মাধ্যমে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি পায়। যেমন, কম আয়ের জনগণের জন্য সরকার আরও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা সেবা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করতে সক্ষম হয়।
সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ:
1. সঠিক আয়ের হিসাব করা:
- কর প্রদানের সামর্থ্য নির্ধারণ করতে হলে, প্রথমে সঠিকভাবে ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের আয় বা সম্পদ পরিমাপ করা প্রয়োজন। কিন্তু, কখনও কখনও লোকেরা তাদের আয়ের পরিমাণ কম দেখানোর চেষ্টা করে, যা কর আদায়ের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
2. প্রথম দিকে প্রগতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন:
- অনেক দেশ বা অঞ্চলে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে, কারণ এর জন্য সঠিক নিয়মাবলী এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন হয়। যদি কর নীতি সঠিকভাবে কার্যকর না হয়, তবে এটি বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে।
3. ছদ্ম নাম বা ফাঁকফোকর ব্যবহার:
- কিছু মানুষ বা প্রতিষ্ঠান তাদের আয়ের পরিমাণ কম দেখানোর মাধ্যমে কম কর প্রদান করার চেষ্টা করতে পারে। এর ফলে, কর প্রদানের সামর্থ্য নীতি সঠিকভাবে কার্যকর হতে পারে না।
উপসংহার:
কর প্রদানের সামর্থ্য নীতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি যা আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী কর আদায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে। এটি সামাজিক সমতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে, এটি সঠিকভাবে কার্যকর করতে প্রয়োজন সঠিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সমাজের সকল স্তরের নাগরিকদের সহানুভূতি ও অংশগ্রহণ।
0 Comments