লেখক পরিচিতি
মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সম্ভ্রান্ত ভূস্বামী জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ও মাতা রাহাতন্নেছা সাবেরা চৌধুরানী। সেকালে নানা কুসংস্কারের কারণে বেগম রোকেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন সম্ভব হয়নি। তাঁর সমগ্র সাহিত্যচর্চাই নারী মুক্তির জন্য নিবেদিত। মুসলমান মেয়েদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তৃত না হলে তাদের মনের প্রসার কিছুতেই সম্ভব হবে না এবং মুসলমান সমাজও কিছুতেই গড়ে উঠবে না- একথা তিনি মর্মে মর্মে
উপলব্ধি করেছিলেন। সেজন্য নিজেই মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম সমাজ-মনের জড়তা ও কুসংস্কার দূর করার জন্য কলমযুদ্ধ চালিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায় ও বলার ভঙ্গিতে কুসংস্কার ও অন্ধ অনুকরণের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ ও দীপ্ত রসিকতার সুর সহজেই চোখে পড়ে। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল ও মুসলমান বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাতয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে তিনি মুসলমান নারীদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করেন। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা : সুলতানার স্বপ্ন, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, মতিচুর।
ভূমিকা
‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধটিতে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাঙালি নারী পুরুষের প্রাত্যহিক জীবনাচরণের বিভিন্ন দিক হাস্যরসাত্মকভাবে বর্ণনা করেছেন। এ রচনায় বাঙালির কর্মে খ্যাতি অর্জনের চেয়ে দয়া-দাক্ষিণ্যে পাওয়া খ্যাতিতে আগ্রহের কথা কটাক্ষ করে তুলে ধরেছেন। বাঙালি পুরুষের কর্মবিমুখতা এবং বাঙালি নারীর দুর্বলচিত্ত ও অহেতুক রূপচর্চা সম্পর্কে এখানে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
মূলপাঠ
আমরা দুর্বল নিরীহ বাঙালি। এই বাঙালি শব্দে কেমন সুমধুর তরল কোমল ভাব প্রকাশ হয়। আহা! এই অমিয়াসিক্ত বাঙালি কোন্ বিধাতা গড়িয়াছিলেন? কুসুমের সৌকুমার্য, চন্দ্রের চন্দ্রিকা, মধুর মাধুরী, যুথিকার সৌরভ, সুপ্তির নীরবতা, ভূধরের অচলতা, নবনীর কোমলতা, সলিলের তরলতা- এক কথায় বিশ্বজগতের সমুদয় সৌন্দর্য এবং স্নিগ্ধতা লইয়া বাঙালি গঠিত হইয়াছে! আমাদের নামটি যেমন শ্রæতিমধুর তদ্রূপ আমাদের সমুদয় ক্রিয়াকলাপও সহজ ও সরল।
আমরা মূর্তিমতী কবিতা- যদি ভারতবর্ষকে ইংরাজি ধরণের একটি অট্টালিকা মনে করেন, তবে বঙ্গদেশ তাহার বৈঠকখানা (drawing room) এবং বাঙালি তাহাতে সাজসজ্জা (drawing room suit)! যদি ভারতবর্ষকে একটা সরোবর মনে করেন, তবে বাঙালি তাহাতে পদ্মিনী। যদি ভারতবর্ষকে একখানা উপন্যাস মনে করেন, তবে বাঙালি তাহার নায়িকা!
ভারতের পুরুষ সমাজে বাঙালি পুরুষিকা! অতএব আমরা মূর্তিমান কাব্য।
আমাদের খাদ্যদ্রব্যগুলো,- পুঁইশাকের ডাঁটা, সজিনা ও পুঁটি মৎস্যের ঝোল- অতিশয় সরস। আমাদের খাদ্যদ্রব্যগুলো- ঘৃত, দুগ্ধ, ছানা, নবনীত, ক্ষীর, সর, সন্দেশ ও রসগোল্লা- অতিশয় সুস্বাদু। আমাদের দেশের প্রধান ফল, আম্র ও কাঁঠাল- রসাল এবং মধুর। অতএব আমাদের খাদ্যসামগ্রী ত্রিগুণাত্মক- সরস, সুস্বাদু, মধুর।
খাদ্যের গুণ অনুসারে শরীরের পুষ্টি হয়। তাই সজিনা যেমন বীজবহুল, আমাদের দেশে তেমনই ভুঁড়িটি স্থূল। নবনীতে কোমলতা অধিক, তাই আমাদের স্বভাবের ভীরুতা অধিক। শারীরিক সৌন্দর্য সম্বন্ধে অধিক বলা নিস্প্রয়োজন; এখন পোষাক পরিচ্ছদের কথা বলি।
আমাদের বর অঙ্গ যেমন তৈলসিক্ত নবনিগঠিত সুকোমল, পরিধেয়ও তদ্রূপ অতি সূ² শিমলার ধূতি ও চাদর। ইহাতে বায়ুসঞ্চালনের (Ventilation এর) কোন বাধা বিঘ্ন হয় না ! আমরা সময় সময় সভ্যতার অনুরোধে কোট শার্ট ব্যবহার করি বটে, কারণ পুরুষমানুষের সবই সহ্য হয়। কিন্তু আমাদের অর্ধাঙ্গীÑ হেমাঙ্গী, কেষ্ণাঙ্গীগণ তদানুকরণে ইংরাজ ললনাদের নির্লজ্জ পরিচ্ছদ (শেমিজ জ্যাকেট) ব্যবহার করেন না। তাঁহারা অতিশয় সুকুমারী ললিতা লজ্জাবতী লতিকা, তাই অতি মসৃণ ও সূক্ষ ‘হাওয়ার শাড়ি’ পরেন। বাঙালির সকল বস্তুই সুন্দর, স্বচ্ছ ও সহজলব্ধ।
বাঙালির গুণের কথা লিখিতে হইলে অনন্ত মসী, কাগজ ও অক্লান্ত লেখকের আবশ্যক। তবে সংক্ষেপে দুটি চারিটা গুণের বর্ণনা করি।
ধনবৃদ্ধির দুই উপায়, বাণিজ্য ও কৃষি। বাণিজ্য আমাদের প্রধান ব্যবসায়। কিন্তু তাই বলিয়া আমরা (আরব্যোপন্যাসের) সিন্ধবাদের ন্যায় বাণিজ্যপোত অনিশ্চিত ফললাভের আশায় অনন্ত অপার সাগরে ভাসাইয়া দিয়া নৈরাশ্যের ঝঞ্ঝাবাতে ওতপ্রোত হই না। আমরা ইহাকে (বাণিজ্য) সহজ ও স্বল্পায়াসসাধ্য করিয়া লইয়াছি। অর্থাৎ বাণিজ্যি ব্যবসায়ে যে কঠিন পরিশ্রম আবশ্যক, তাহা বর্জন করিয়াছি। এই জন্য আমাদের দোকানে প্রয়োজনীয় জিনিষ নাই, শুধু বিলাসদ্রব্য- নানাবিধ কেশতৈল ও নানাপ্রকার রোগবর্ধক ঔষধ এবং রাঙা পিত্তলের অলঙ্কার, নকল হীরার আংটি, বোতাম ইত্যাদি বিক্রয়ার্থ মজুদ আছে। ঈদৃশ ব্যবসায়ে কায়িক পরিশ্রম নাই। আমরা খাঁটি সোনা রূপা জওযাহেরাৎ রাখি না, কারণ টাকার অভাব। বিশেষতঃ আজি কালি কোন্ জিনিষটার নকল না হয়?
যখনই কেহ একটু যত্ন পরিশ্রম স্বীকার পূর্বক “দীর্ঘকেশী” তৈল প্রস্তুত করেন, অমনই আমরা তদনুকরণে “হ্রস্বকেশী” বাহির করি। “কুন্তলীনের” সঙ্গে “কেশলীন” বিক্রয় হয়। বাজারে “মস্তিষ্ক স্নিগ্ধকারী” ঔষধ আছে, “মস্তিষ্ক উষ্ণকারী” দ্রব্যও আছে।
এক কথায় বলি, যত প্রকারের নকল ও নিস্প্রয়োজনীয় জিনিষ হইতে পারে, সবই আছে। আমরা ধান্য তগুলের ব্যবসায় করি না, কারণ তাহাতে পরিশ্রম আবশ্যক। আমাদের অন্যতম ব্যবসায়Ñ পাস বিক্রয়। এই পাস বিক্রেতার নাম “বর” এবং ক্রেতাকে “শ্বশুর” বলে। এক একটি পাসের মূল্য কত জান? “অর্ধেক রাজত্ব ও এক রাজকুমারী”। এমএ পাস অমূল্যরত্ন, ইহা যে সে ক্রেতার ক্রেয় নহে। নিতান্ত সস্তা দরে বিক্রয় হইলে, মূল্য- এক রাজকুমারী এবং সমুদয় রাজত্ব। আমরা অলস, তরলমতি, শ্রমকাতর, কোমলাঙ্গ বাঙালি কিনা তাই ভাবিয়া দেখিয়াছি, সশরীরে পরিশ্রম করিয়া মুদ্রালাভ করা অপেক্ষা Old fool শ্বশুরের যথাসর্বস্ব লুণ্ঠন করা সহজ।
এখন কৃষিকার্যের কথা বলি। কৃষি দ্বারা অন্নবৃদ্ধি হইতে পারে। কিন্তু আমরা ভাবিয়া দেখিয়াছি কৃষিবিভাগের কার্য (Agriculture) করা অপেক্ষা মস্তিষ্ক উর্বর (Brain culture) করা সহজ। অর্থাৎ কর্কশ উর্বর ভূমি কর্ষণ করিয়া ধান্য উৎপাদন করা অপেক্ষা মুখস্থ বিদ্যার জোরে অর্থ উৎপাদন করা সহজ। এবং কৃষিকার্যে পারদর্শিতা প্রদর্শন করা অপেক্ষা কেবল M.R.A.C পাশ করা সহজ। আইনচর্চা করা অপেক্ষা কৃষি বিষয়ে জ্ঞানচর্চা করা কঠিন। অথবা রৌদ্রের সময় ছত্র হস্তে কৃষিক্ষেত্র পরিদর্শনের জন্য কৃষি বিষয়ে জ্ঞানচর্চা অপেক্ষা টানাপাখার তলে আরাম কেদারায় বসিয়া দুর্ভিক্ষ সমাচার (Famine Report ) পাঠ করা সহজ। তাই আমরা অন্নোৎপাদনের চেষ্টা না করিয়া অর্থ উৎপাদনে সচেষ্ট আছি। আমাদের অর্থের অভাব নাই, সুতরাং অন্নকষ্টও হইবে না। দরিদ্র হতভাগা সব অন্নাভাবে মরে মরুক, তাতে আমাদের কী?
আমরা আরও অনেক প্রকার সহজ কার্য নির্বাহ করিয়া থাকি। যথা :
(১) রাজ্য স্থাপন করা অপেক্ষা “রাজ্য” উপাধি লাভ সহজ।
(২) শিল্পকার্যে পারদর্শী হওয়া অপেক্ষা B.Sc ও D.Sc পাস করা সহজ।
(৩) অল্পবিস্তর অর্থব্যয়ে দেশে কোন মহৎ কার্য দ্বারা খ্যাতি লাভ করা অপেক্ষা “খাঁ বাহাদুর” বা “রায় বাহাদুর” উপাধি লাভের জন্য অর্থ ব্যয় করা সহজ।
(৪) প্রতিবেশী দরিদ্রদের শোক দুঃখে ব্যথিত হওয়া অপেক্ষা বেদেশীয় বড় লোকদের মৃত্যুদুঃখে “শোক সভার” সভ্য হওয়া সহজ।
(৫) দেশের দুর্ভিক্ষ নিবারণের জন্য পরিশ্রম করা অপেক্ষা আমেরিকার নিকট ভিক্ষা গ্রহণ করা সহজ।
(৬) স্বাস্থ্যরক্ষায় যতত্নবান হওয়া অপেক্ষা স্বাস্থ্য নষ্ট করিয়া ঔষধ ও ডাক্তারের হস্তে জীবন সমর্পণ করা সহজ।
(৭) স্বাস্থ্যের উন্নতি দ্বারা মুখশ্রীর প্রফুল্লতা ও সৌন্দর্য বর্ধন করা (অর্থাৎ healthy & cheerful হওয়া) অপেক্ষা (শুষ্কগন্ডে) কালিডোর, মিল্ক অভ রোজ ও ভিনোলিয়া পাউডার (Kalydore, milk of rose and Vinolia powder) মাখিয়া সুন্দর হইতে চেষ্টা করা সহজ।
(৮) কাহারও নিকট প্রহারলাভ করিয়া তৎক্ষণাৎ বাহুবলে প্রতিশোধ লওয়া অপেক্ষা মানহানির মোকদ্দমা করা সহজ ইত্যাদি।
তারপর আমরা মূর্তিমান আলস্য- আমাদের গৃহিণীগণ এ বিষয়ে অগ্রণী। কেহ কেহ শ্রীমতীদিগকে স্বহস্তে রন্ধন করিতে অনুরোধ করিয়া থাকেন। কিন্তু বলি, আমরা যদি রৌদ্রতাপ সহ্য করিতে না পারি, তবে আমাদের অর্ধাঙ্গীগণ কিরূপে অগ্নিত উত্তাপ সহিবেন? আমরা কোমলাঙ্গ- তাঁহারা কোমলাঙ্গী; আমরা পাঠক, তাঁহারা পাঠিকা; আমরা লেখক, তাঁহারা লেখিকা।
অতএব আমরা পাচক না হইলে তাঁহারা পাচিকা হইবেন কেন? সুতরাং যে লক্ষীছাড়া দিব্যাঙ্গনাদিগকে রন্ধন করিতে বলে, তাহার ত্রিবিধ দন্ড হওয়া উচিত। যথা তাহাকে (১) তুষানলে দগ্ধ কর, অতঃপর (২) জবেহ্ কর, তারপর (৩) ফাঁসি দাও !
আমরা সকলেই কবি- আমাদের কাব্যে বীররস অপেক্ষা করুণরস বেশি। আমাদের এখানে লেখক অপেক্ষা লেখিকার সংখ্যা বেশি। তাই কবিতার স্রোতে বিনা কারণে অশ্রুপ্রবাহ বেশি বহিয়া থাকে। আমরা পদ্য লিখিতে বসিলে কোন্ বিষয়টা বাদ দিই? “ভগ্ন শূর্প”, “জীর্ণ কাঁথা”, “পুরাতন চটিজুতা”- কিছুই পরিত্যাজ্য নহে। আমরা আবার কত নতুন শব্দের সৃষ্টি করিয়াছি; যথা- “অতি শুভ্রনীলাম্বর”, “সাশ্রুসজলনয়ন” ইত্যাদি। শ্রীমতীদের করুণ বিলাপ-প্রলাপপূর্ণ পদ্যের “অশ্রুজলের” বন্যায় বঙ্গদেশ ধীরে ধীরে ডুবিয়া যাইতেছে ! সুতরাং দেখিতেছেন, আমরা সকলেই কবি। আর আত্মপ্রশংসা কত করিব? এখন উপসংহার করি।
নির্বাচিত শব্দের অর্থ ও টীকা :
অমিয়াসিক্ত- অমৃত বা সুধা দ্বারা ভেজা। আত্মপ্রশংসা- নিজের প্রশংসা। অন্নোৎপাদন- খাদ্য উৎপাদন। কর্ষণ- চাষ। কালিডোর, মিল্ক অব রোজ, ভিনোলিয়া পাউডার- সৌন্দর্যবর্ধক সামগ্রী। কোমলাঙ্গ- নরম শরীর। কুন্তলীন- লেখকের আমলে চুলে দেয়ার জনপ্রিয় তেলের নাম। কৃষ্ণাঙ্গী- কালো বর্ণের দেহ। চন্দ্রিকা- জ্যোৎস্না। জওয়াহেরাৎ- মণিরত্মাদি; বহুমূল্যবান প্রস্তরসমূহ। জীর্ণ- শীর্ণ, ক্ষয়প্রাপ্ত। ঝঞ্ঝাবাতে- ঝঞ্ঝার বাতাসে। তরলমতি- অস্থির; চঞ্চল। তগুল- চাল। তুষানল- জ্বলন্ত তুষের আগুন যা ধিক ধিক করে বহুক্ষণ ধরে জ্বলে। ত্রিবিধ- তিন প্রকার। দিব্যাঙ্গনা- স্বর্গের রূপসি; হুরপরি। নবনী- ননী; মাখন। নৈরাশ্য- আশাহীনতা; হতাশা। পরিত্যাজ্য- বর্জনীয়; বর্জন বা ত্যাগ করা যায় এমন। পদ্মিনী- কমলিনী; পদ্মযুক্তা। পারদর্শিতা- বিচক্ষণতা; দক্ষতা । ভগ্ন শূর্প- ভাঙা কুলা। মসী-হাওয়ার শাড়ি- সূক্ষসুতোর শাড়ি। মূর্তিমান- সাকার; মূর্তি বা শরীর ধারণ করেছে এমন। যূথিকা- যুঁই ফুল। শুভ্রনীলাম্বর- পরিষ্কার নীল আকাশ। শ্রমকাতর- পরিশ্রম বা মেহনত করতে কষ্ট বোধ করে এমন। সলিল- পানি; বারি। সমুদয়- সব; সকল। সাশ্রুসজলনয়ন- জলভরা চোখ। সুপ্তি- তন্দ্রা; ঘুম। হেমাঙ্গী- সুন্দরী নারী। সৌকুমার্য- সৌন্দর্য।
সারসংক্ষেপ :
বাঙালি অপ্রয়োজনীয় রকমের নিরীহ আর কোমল। উপন্যাসের নায়িকা যেমন, সাহিত্যে কাব্য যেমন, বাঙালিও অনেকটা সেরকম। বাঙালির খাবার, পোশাক আর অবয়বেও লেখক প্রয়োজনীয় দৃঢ়তার অভাব লক্ষ করেছেন। বাণিজ্য বাঙালি করে বটে, কিন্তু তাতে উদ্যমের বড়ই অভাব। কৃষিকাজের পরিশ্রম নয়, সে চায় মস্তিষ্কচর্চার আরাম আর আলস্য। নকল করায় সে ওস্তাদ, ফাঁকিতে সিদ্ধহস্ত; সার্টিফিকেট বিক্রি করে শ্বশুরের অর্থ লুণ্ঠনে তার ব্যাপক আগ্রহ। আলস্যে বাঙালি নারীও কম যায় না। বাংলা অঞ্চলে বীররস দুর্লভ। এখানে করুণরসেরই প্রাধান্য। হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে লেখক বাঙালি জীবনের বহুদিকের সমালোচনা করেছেন। এর মধ্য দিয়ে আত্মসমালোচনা করে উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়ার আকাক্সক্ষাই প্রকাশিত হয়েছে।
সৃজনশীল প্রশ্ন-১
নন্দ বাড়ির হতো না বাহির, কোথা কী ঘটে কি জানি,
চড়িত না গাড়ি, কি জানি কখন উল্টায় গাড়িখানি।
নৌকা ফি-সন ডুবিছে ভীষণ, রেলে কলিশন হয়,
হাঁটিলে সর্প, কুকুর আর গাড়ি চাপা পড়ার ভয়।
তাই শুয়ে শুয়ে কষ্টে বাঁচিয়া রহিল নন্দলাল-
সকলে বলিল, ‘ভ্যালারে নন্দ, বেঁচে থাক চিরকাল।’
ক. ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে লেখিকা কোনটিকে ত্রিগুণাত্মক বলেছেন?
খ. ‘আমাদের অন্যতম ব্যবসায় পাস বিক্রয়।’ -উক্তিটি বুঝিয়ে বলুন।
গ. উদ্দীপকের নন্দলাল ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে কাদের প্রতিনিধিত্ব করে? -আলোচনা করুন।
ঘ. “উদ্দীপকের নন্দলালের ভীরুতা ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে।” -মন্তব্যটি বিচার করুন।
নমুনা উত্তর : সৃজনশীল প্রশ্ন
সৃজনশীল প্রশ্ন-১ এর নমুনা উত্তর:
ক. ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে লেখক সরস, সুস্বাদু ও মধুরকে ত্রিগুণাত্মক বলেছেন।
খ. বরের পাস করা ডিগ্রিকে ‘নিরীহ বাঙালী’ প্রবন্ধে লেখক রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন আমাদের অন্যতম ব্যবসায় বলে উল্লেখ করেছেন। বাঙালি বরেরা তাদের পাস করা ডিগ্রিকে শ্বশুরপক্ষের কাছে বিক্রি করে কন্যাপক্ষ থেকে অধিক পরিমাণে যৌতুক গ্রহণ করে। তারা নিজেদের শিক্ষাকে বিক্রি করে কন্যা ও কন্যার পিতার সম্পত্তি উভয়ই দাবি করে। তাই লেখক উক্তিটি বরেছেন।
গ. নন্দলালের বৈশিষ্ট্য ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে অলস বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব করে। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। তবে বাঙালির অনগ্রসরতার মূলে রয়েছে তাদের শ্রমবিমুখতা। তারা অলস প্রকৃতির। কোনভাবে উদরপূর্তি করতে পারলেই গা এলিয়ে ঘুমায়, পরের বেলার খাবারের কথা ভাবে না। বাঙালির এ স্বভাব তাদের উন্নতির প্রধান অন্তরায়। উদ্দীপকে নন্দলালের ঘরে বসে থাকার কারণ ও জীবন যাপনের ধরন তুলে ধরা হয়েছে। এতে নন্দলালের শ্রমবিমুখতা এবং তার আলস্যভরা জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। বাড়ির বাইরে গেলে কোথায় কোন সমস্যায় পড়ে এই ভয়ে সে সব কাজ ফেলে শুয়ে শুয়ে দিন কাটাতে পছন্দ করে। তার এই মূল্যহীন যুক্তি ও অলসতা ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধের বাঙালির কার্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আমাদের সমাজে নন্দলালের মতো অনেক লোক রয়েছে যারা দেশসেবার নামে আলস্য ও প্রাণ বাঁচানোকে একমাত্র লক্ষ্য মনে করে। কীসে মর্যাদা বাড়ে, আর কীসে কমে সেদিকে তাদের ভ্রক্ষেপ নেই। ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে বাঙালিদের অবস্থাও তাই। তারা অমর্যাদাকর জীবনযাপন করতে আগ্রহী। কর্ম করে জীবনের উন্নতি করতে নারাজ। বলা যায়, উদ্দীপকের নন্দলালের বৈশিষ্ট্য ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধের কার্যক্রমকে ইঙ্গিত করে।
ঘ. বাঙালি জাতি পরিশ্রম করা অপেক্ষা তোষামোদ করাকে বেশি পছন্দ করে, করুণার পাত্র হয়ে বাঁচতে দ্বিধাবোধ করে না যা উদ্দীপকের নন্দলালের ভীরুতার সমপর্যায়ে পড়ে। উদ্দীপকে নন্দলালের কোনো একটা সমস্যা ও সংকটের ভয় এবং অলসতাকে তুলে ধরা হয়েছে। সাপ ও কুকুরের ভয়ে সে বাইরে যায় না। কলিশন ও গাড়ি চাপার ভয়ে কোথাও ভ্রমণ করে না। শুধু শুয়ে শুয়ে বহু কষ্টে সময় কাটায়। তার সবসময় ভয়। অন্যদিকে কর্মবিমুখতা বাঙালির মজ্জাগত স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য। ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে লেখক এই বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করেছেন। বাঙালি নারী-পুরুষ কীভাবে তাদের জীবন পরিচালনায় অলসতার পরিচয় দেয় তা উপস্থাপন করেছেন। ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে লেখক হাস্যরসের মাধ্যমে বাঙালি পুরুষের কর্মবিমুখতা এবং বাঙালি নারীর দুর্বলচিত্ততা এবং অহেতুক রূপচর্চা সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। অমর্যাদাকর অলসতাকে বাঙালি কীভাবে গ্রহণ করে আর মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের ক্ষেত্রে কীভাবে শ্রমবিমুখ হয় সেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। উদ্দীপকে ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধের এই দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে। কারণ নন্দলাল বাঙালির অলসতা, কর্মবিমুখতা ও আত্মমর্যাদাহীন জীবন যাপনের প্রতীক।
অ্যাসাইনমেন্ট : নিজে করুন
সৃজনশীল প্রশ্ন:
বাঙালির মতো জ্ঞানশক্তি ও প্রেমশক্তি (ব্রেন সেন্টার ও হার্ট সেন্টার) এশিয়ায় কেন, বুঝি পৃথিবীতে কোনো জাতির নেই। কিন্তু কর্মশক্তি একবারে নেই বলেই তাদের এই দিব্যশক্তি তমসাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাদের কর্মবিমুখতা, জড়ত্ব, মৃত্যুভয়, আলস্য, তন্দ্রা, নিদ্রা, ব্যবসায়-বাণিজ্যে অনিচ্ছার কারণে তারা তামসিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে চেতনা শক্তিকে হারিয়ে ফেলেছে।
ক. ‘অবরোধ বাসিনী’ গ্রন্থটির লেখক কে?
খ. ‘আমাদের স্বভাবে ভীরুতা অধিক।’ -বুঝিয়ে বলুন।
গ. উদ্দীপকের সঙ্গে ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধের যে দিকটি সাদৃশ্যপূর্ণ তা আলোচনা করুন।
ঘ. “নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধের মূল ভাবই যেন উদ্দীপকে প্রকাশিত হয়েছে।” -মূল্যায়ন করুন।
0 Comments