Recent Posts

বই পড়া - প্রমথ চৌধুরী

 

লেখক পরিচিতি 

প্রমথ চৌধুরী ১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস পাবনা জেলার চাটমোহর থানার হরিপুর গ্রামে। কলকাতা হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন, ১৮৮৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে বিএ ও ১৮৯০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে এমএ পাস করেন। ১৮৯৩ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলাত যান। ব্যারিস্টারি পাস করে ফিরে আসলেও তিনি সে-পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেননি। প্রমথ চৌধুরী নিজেকে প্রধানত সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত রেখেছিলেন। ১৯১৪ সালে তাঁর সম্পাদনায় ‘সবুজ পত্র’ নামক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাংলা কথ্যরীতির সাহিত্যিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা লাভ করে তাঁরই হাতে। এ ব্যাপারে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। সাহিত্যক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরীর প্রধান খ্যাতি মননশীল প্রবন্ধলেখক হিসেবে। শাণিত যুক্তি, আলঙ্কারিক ভাষা, বুদ্ধিদীপ্ত তীর্যক ভঙ্গি এবং চলিত রীতির সঙ্গে স্যাটায়ার ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক ভাষার প্রয়োগের মাধ্যমে একটি নতুন গদ্যধারার জন্ম দেন তিনি। এ রচনার ধারাই ‘বীরবলী’ গদ্যের ধারা নামে পরিচিত। প্রমথ চৌধুরী ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। প্রমথ চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য রচনা :

 প্রবন্ধ গ্রন্থ : তেল-নুন-লাকড়ি, বীরবলের হালখাতা, আমাদের শিক্ষা, রায়তের কথা;

 গল্প গ্রন্থ : চার ইয়ারি কথা, আহুতি;

 কাব্য : সনেট পঞ্চাশৎ।

ভূমিকা

একটি লাইব্রেরির বার্ষিক সভায় পঠিত ‘বইপড়া’ প্রবন্ধটি প্রমথ চৌধুরীর ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ থেকে নির্বাচন করা হয়েছে। এ প্রবন্ধে বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। সমাজকে সভ্য ও প্রগতিশীল করতে হলে সাহিত্যচর্চার যে কোনো বিকল্প নেই তাই প্রবন্ধকার বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছেন। এ প্রবন্ধে প্রগতিশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে বই পড়ার উপযোগিতা, আবশ্যকতা, পাঠকের মানসিকতা ও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা লেখক সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। 

পাঠ-১

মূলপাঠ

বই পড়া শখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ হলেও আমি কাউকে শখ হিসেবে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাইনে। প্রথমত, সে পরামর্শ কেউ গ্রাহ্য করবেন না; কেননা, আমরা জাত হিসেবে শৌখিন নই। দ্বিতীয়ত, অনেকে তা কুপরামর্শ মনে করবেন; কেননা, আমাদের এখন ঠিক শখ করবার সময় নয়। আমাদের এই রোগ-শোক, দুঃখ-দারিদ্র্যের দেশে সুন্দর জীবন ধারণ করাই যখন হয়েছে প্রধান সমস্যা, তখন সেই জীবনকেই সুন্দর করা, মহৎ করার প্রস্তাব অনেকের কাছে নিরর্থক এবং নির্মমও ঠেকবে। আমরা সাহিত্যের রস উপভোগ করতে প্রস্তুত নই; কিন্তু শিক্ষার ফল লাভের জন্য আমরা সকলে উদ্বাহু। আমাদের বিশ্বাস শিক্ষা আমাদের গায়ের জ্বালা ও চোখের জল দুই-ই দূর করবে। এ আশা সম্ভবত দুরাশা; কিন্তু তা হলেও আমরা তা ত্যাগ করতে পারি নে। কেননা, আমাদের উদ্ধারের জন্য কোনো সদুপায় আমরা চোখের সুমুখে দেখতে পাইনে। শিক্ষার মাহাত্ম্যে আমিও বিশ্বাস করি এবং যিনিই যাই বলুন সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। লোকে যে তা সন্দেহ করে, তার কারণ এ শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ তার কোনো নগদ বাজার দর নেই। এই কারণে ডেমোক্রেসি সাহিত্যের সার্থকতা বোঝে না, বোঝে শুধু অর্থের সার্থকতা। ডেমোক্রেসির গুরুরা চেয়েছিলেন সকলকে সমান করতে কিন্তু তাদের শিষ্যরা তাদের কথা উল্টো বুঝে সকলেই হতে চায় বড় মানুষ।

একটি বিশিষ্ট অভিজাত সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েও ইংরেজি সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা ডেমোক্রেসির গুণগুলো আয়ত্ত করতে না পেরে তার দোষগুলো আত্মসাৎ করেছি। এর কারণও স্পষ্ট। ব্যাধিই সংক্রামক ¯^াস্থ্য নয়। আমাদের শিক্ষিত সমাজের লোলুপদৃষ্টি আজ অর্থের ওপরই পড়ে রয়েছে। সুতরাং সাহিত্যচর্চার সুফল সম্বন্ধে অনেকেই সন্দিহান। যাঁরা হাজারখানা ল-রিপোর্ট কেনেন, তারা একখানা কাব্যগ্রন্থও কিনতে প্রস্তুত নন, কেননা, তাতে ব্যবসার কোনো সুসার নেই। নজির না আউড়ে কবিতা আবৃত্তি করলে মামলা যে হারতে হবে সে তো জানা কথা, কিন্তু যে কথা জজে শোনে না, তার যে কোনো মূল্য নেই, এইটেই হচ্ছে পেশাদারদের মহাভ্রান্তি। জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের ভান্ডার নয় এ সত্য তো প্রত্যক্ষ। কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও সমান সত্য যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী। তারপর যে জাতি মনে বড় নয়, সে জাতি জ্ঞানেও বড় নয়; কেননা ধনের সৃষ্টি যেমন জ্ঞান সাপেক্ষ তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টি মন সাপেক্ষ এবং মানুষের মনকে সরল, সচল, সরাগ ও সমৃদ্ধ করার ভার আজকের দিনে সাহিত্যের ওপরও ন্যস্ত হয়েছে। কেননা,

মানুষের দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্মনীতি, অনুরাগ-বিরাগ, আশা-নৈরাশ্য, তার অন্তরের সত্য ও স্বপ্ন এই সকলের সমবায়ে সাহিত্যের জন্ম। অপরাপর শাস্ত্রের ভিতর যা আছে সেসব হচ্ছে মানুষের মনের ভগ্নাংশ; তার পুরো মনটার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় শুধু সাহিত্যে। দর্শন বিজ্ঞান ইত্যাদি হচ্ছে তার মনগঙ্গার তোলা জল, তার পূর্ণ শ্রোত আবহমানকাল সাহিত্যের ভেতরই সোল্লাসে সবেগে বয়ে চলেছে এবং সেই গঙ্গাতে অবগাহন করেই আমরা আমাদের সকল পাপমুক্ত হব।

অতএব, দাঁড়াল এই যে, আমাদের বই পড়তে হবে, কেননা বই পড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ান্তর নেই। ধর্মের চর্চা চাই কি মন্দিরের বাইরেও করা চলে, দর্শনের চর্চা গুহায়, নীতির চর্চা ঘরে এবং বিজ্ঞানের চর্চা জাদুঘরে; কিন্তু সাহিত্যের চর্চার জন্য চাই লাইব্রেরি; ও-চর্চা মানুষে কারখানাতেও করতে পারে না; চিড়িয়াখানাতেও নয়। এইসব কথা যদি সত্য হয়, তাহলে আমাদের মানতেই হবে যে, সাহিত্যের মধ্যে আমাদের জাত মানুষ হবে। সেইজন্য আমরা যত বেশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার হবে।

আমাদের মনে হয়, এ দেশে লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয় এবং স্কুল-কলেজের চাইতে একটু বেশি। একথা শুনে অনেকে চমকে উঠবেন। কেউ কেউ আবার হেসেও উঠবেন; কিন্তু আমি জানি, আমি রসিকতাও করছিনে, অদ্ভুত কথাও বলছিনে; যদিও এ বিষয়ে লোকমত যে আমার মতের সমরেখায় চলে না, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। অতএব আমার কথার আমি কৈফিয়ত দিতে বাধ্য। আমার বক্তব্য আমি আপনাদের কাছে নিবেদন করছি তার সত্য মিথ্যার বিচার আপনারা করবেন। সে বিচারে আমার কথা যদি না টেকে তাহলে রসিকতা হিসেবেই গ্রাহ্য করবেন।

আমার বিশ্বাস শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। আজকের বাজারে বিদ্যাদাতার অভাব নেই। এমন কি, এ ক্ষেত্রে দাতাকর্ণেরও অভাব নেই; এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দ্বারস্থ করেই নিশ্চিত থাকি এই বিশ্বাসে যে, সেখানে থেকে তারা এতটা বিদ্যার ধন লাভ করে ফিরে আসবে যার সুদে তার বাকি জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এ বিশ্বাস নিতান্ত অমূলক। মনোরাজ্যের দান গ্রহণসাপেক্ষ, অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে গ্রহীতার কথাটা একেবারেই ভুলে যাই। এ সত্য ভুলে না গেলে আমরা বুঝতাম যে, শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষাদান করায় নয়, কিন্তু ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায়। শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন, তার কৌতূহল উদ্রেক করতে পারেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারেন, মনোরাজ্যের ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারেন, তার জ্ঞান পিপাসাকে জ্বলন্ত করতে পারেন, এর বেশি আর কিছু পারেন না। যিনি যথার্থ গুরু, তিনি শিষ্যের আত্মাকে উদ্বোধিত করেন এবং তার অন্তর্নিহিত সকল প্রচ্ছন্ন শক্তিকে মুক্ত ও ব্যক্ত করে তোলেন। সেই শক্তির বলে সে নিজের মন নিজে গড়ে তোলে, নিজের অভিমত্ব-বিদ্যা নিজে অর্জন করে। বিদ্যার সাধনা শিষ্যকে নিজে করতে হয়। গুরু উত্তরসাধক মাত্র। 


নির্বাচিত শব্দের অর্থ ও টীকা : 

অবগাহন- সর্বাঙ্গ ডুবিয়ে গোসল। আবহমানকাল- চিরকাল। উত্তরসাধক- পরবর্তীকালের সাধক বা সহায়ক। উদ্বাহু- ঊর্ধ্ববাহু; আহ্লাদে হাত উঠানো। উপায়ান্তর- অন্য কোনো উপায়। জজ- বিচারক। ডেমোক্রেসি- গণতন্ত্র। নিরর্থক- অর্থহীন। প্রচ্ছন্ন- আবৃত বা ঢাকা। প্রত্যক্ষ- স্পষ্ট; দৃষ্ট। ভাঁড়ে ভবানী- রিক্ত; শূন্য। মহাভ্রান্তি- ভীষণ ভুল ধারণা। মাহাত্ম্য- মহিমা; গৌরব। রিপোর্ট- আইন সংক্রান্ত প্রতিবেদন। লাইব্রেরি- পাঠাগার; গ্রন্থাগার; পুস্তকাগার। শৌখিন- রুচিবান। সন্দিহান- সন্দেহযুক্ত। সোল্লাসে- উল্লাসসহ; সানন্দে। সংক্রামক- ছোঁয়াচে; সংস্পর্শে উৎপন্ন। স্বশিক্ষিত- নিজে নিজে শিক্ষিত।


সারসংক্ষেপ :

বই পড়ায় নগদ লাভ হয় না; কিন্তু ব্যক্তি ও জাতির মনের বিকাশের জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই। অন্য অনেক বাস্তব জ্ঞানের বইয়ের তুলনায় সাহিত্যেই মনের বিকাশ ভালো হয়। কারণ, সাহিত্যেই মানুষের জীবনের সার্বিক চিত্রটা ধরা পড়ে। বই পড়ার জন্য দরকার লাইব্রেরি। শরীরের চিকিৎসার জন্য যেমন হাসপাতাল দরকার, মনের বিকাশের জন্যও তেমনি লাইব্রেরি প্রয়োজন। লাইব্রেরিতে মানুষ নিজের আনন্দে শ্রেচ্ছায় বই পড়ে। এরকম স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হলেই কেবল মানুষ সুশিক্ষিত হতে পারে।


পাঠ-২

মূলপাঠ

আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষার পদ্ধতি ঠিক উলটো। সেখানে ছেলেদের বিদ্যে গেলানো হয়, তারা তা জীর্ণ করতে পারুক আর নাই পারুক। এর ফলে ছেলেরা শারীরিক ও মানসিক মন্দাগ্নিতে জীর্ণশীর্ণ হয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসে। একটা জানাশোনা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যাক। আমাদের সমাজে এমন অনেক মা আছেন যাঁরা শিশু সন্তানকে ক্রমাš^য়ে গরুর দুধ গেলানোটাই শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষার ও বলবৃদ্ধির সর্বপ্রধান উপায় মনে করেন। দুগ্ধ অবশ্য অতিশয় উপাদেয় পদার্থ, কিন্তু তার উপকারিতা যে ভোক্তার জীর্ণ করবার শক্তির ওপর নির্ভর করে এ জ্ঞান ও শ্রেণির মাতৃকুলের নেই। তাদের বিশ্বাস ওÑবস্তু পেটে গেলেই উপকার হবে। কাজেই শিশু যদি তা গিলতে আপত্তি করে তাহলে সে যে বেয়াড়া ছেলে, সে বিষয়ে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না। অতএব তখন তাকে ধরে বেঁধে জোর জবরদস্তি করে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। শেষটায় সে যখন এই দুগ্ধপান ক্রিয়া হতে অব্যাহতি লাভ করার জন্য মাথা নাড়াতে, হাতপা ছুড়তে শুরু করে, তখন স্নেহময়ী মাতা বলেন, আমার মাথা খাও, মরামুখ দেখ, এই ঢোক, আর এক ঢোক, আর এক ঢোক ইত্যাদি। মাতার উদ্দেশ্য যে খুব সাধু, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, উক্ত বলা কওয়ার ফলে মা শুধু ছেলের যকৃতের মাথা খান এবং ঢোকের পর ঢোকে তার মরামুখ দেখবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে চলেন। আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষা পদ্ধতিটাও ঐ একই ধরনের। এর ফলে কত ছেলের সুস্থ সরল মন যে ইনফ্যান্টাইল লিভারে গতাসু হচ্ছে তা বলা কঠিন। কেননা দেহের মৃত্যুর রেজিস্টারি রাখা হয়, আত্মার মৃত্যুর হয় না। আমরা কিন্তু এই আত্মার অপমৃত্যুতে ভীত হওয়া দূরে থাক, উৎফুল্ল হয়ে উঠি। আমরা ভাবি দেশে যত ছেলে পাশ হচ্ছে তত শিক্ষার বিস্তার হচ্ছে। পাশ করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয়, এ সত্য স্বীকার করতে আমরা কুণ্ঠিত হই। শিক্ষা শাস্ত্রের একজন জগদ্বিখ্যাত ফরাসি শাস্ত্রী বলেছেন যে, এক সময়ে ফরাসি দেশে শিক্ষা পদ্ধতি এতই বেয়াড়া ছিল যে, সে যুগে France was saved by her idlers ; অর্থাৎ যারা পাশ করতে পারেনি বা চায়নি তারাই ফ্রান্সকে রক্ষা করেছে। এর কারণ, হয় তাদের মনের বল ছিল বলে কলেজের শিক্ষাকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল, নয় সে শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করেছিল বলেই তাদের মনের বল বজায় ছিল। তাই এই স্কুল-পালানো ছেলেদের দল থেকে সে যুগের ফ্রান্সের যত কৃতকর্মা লোকের আবির্ভাব হয়েছিল। 

সে যুগে ফ্রান্সে কী রকম শিক্ষা দেওয়া হতো তা আমার জানা নেই। তবুও আমি জোর করে বলতে পারি যে, এ যুগে আমাদের স্কুল কলেজে শিক্ষার যে রীতি চলছে, তার চাইতে সে শিক্ষাপদ্ধতি কিছুতেই নিকৃষ্ট ছিল না। সকলেই জানেন যে, বিদ্যালয়ে মাস্টার মহাশয়েরা নোট দেন এবং সেই নোট মুখস্থ করে তারা হয় পাশ। এর জুড়ি আর একটি ব্যাপারও আমাদের দেশে দেখা যায়। এদেশে একদল বাজিকর আছে, যারা বন্দুকের গুলি থেকে আরম্ভ করে উত্তরোত্তর কামানের গুলি পর্যন্ত গলাধঃকরণ করে। তারপর একে একে সবগুলো উগলে দেয়। এর ভেতর যে অসাধারণ কৌশল আছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই গেলা আর ওগলানো দর্শকের কাছে তামাশা হলেও বাজিকরের কাছে তা প্রাণান্তকর ব্যাপার। ও কারদানি করা তার পক্ষে যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি অপকারী। বলা বাহুল্য, সে বেচারাও লোহার গোলাগুলোর এক কণাও জীর্ণ করতে পারে না। আমাদের ছেলেরাও তেমনি নোট নামক গুরুদত্ত নানা আকারের ও নানা প্রকারের গোলাগুলো বিদ্যালয়ে গলাধঃকরণ করে পরীক্ষালয়ে তা উদ্গীরণ করে দেয়। এ জন্য সমাজ বাহবা দেয় দিক, কিন্তু মনে যেন না ভাবে যে, এ জাতির প্রাণশক্তি বাড়ছে। স্কুল কলেজের শিক্ষা যে অনেকাংশে ব্যর্থ, সে বিষয়ে প্রায় অধিকাংশ লোকই একমত। আমি বলি, শুধু ব্যর্থ নয়, অনেক স্থলে মারাত্মক; কেননা আমাদের স্কুল কলেজের ছেলেদের স্বশিক্ষিত হবার সে সুযোগ দেয় না, শুধু তাই নয়, স্বশিক্ষিত হবার শক্তি পর্যন্ত নষ্ট করে। আমাদের শিক্ষাযন্ত্রের মধ্যে যে যুবক নিষ্পেষিত হয়ে বেরিয়ে আসে, তার আপনার বলতে বেশি কিছু থাকে না, যদি না তার প্রাণ অত্যন্ত কড়া হয়। সৌভাগ্যের বিষয়, এই ক্ষীণপ্রাণ জাতির মধ্যেও জনকতক এমন কঠিন প্রাণের লোক আছে, এহেন শিক্ষাপদ্ধতিও তাদের মনকে জখম করলেও একেবারে বধ করতে পারে না। 


আমি লাইব্রেরিকে স্কুল কলেজের ওপরে স্থান দিই এই কারণে যে, এ স্থলে লোকে স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দচিত্তে স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ পায়; প্রতিটি লোক তার স্বীয় শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। স্কুল-কলেজ বর্তমানে আমাদের যে অপকার করছে সে অপকারের প্রতিকারের জন্য শুধু নগরে নগরে নয়, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য। আমি পূর্বে বলেছি যে, লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয়, তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল।

অতঃপর আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে, বই পড়ার পক্ষ নিয়ে এ ওকালতি করবার, বিশেষত প্রাচীন নজির দেখাবার কী প্রয়োজন ছিল? বই পড়া যে ভালো, তা কে না মানে? আমার উত্তর সকলে মুখে মানলেও কাজে মানে না। মুসলমান ধর্মে মানবজাতি দুই ভাগে বিভক্ত। যারা কেতাবি, আর এক যারা তা নয়। বাংলায় শিক্ষিত সমাজ যে পূর্বদলভুক্ত নয়, একথা নির্ভয়ে বলা যায় না; আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় মোটের ওপর বাধ্য না হলে বই স্পর্শ করেন না। ছেলেরা যে নোট পড়ে এবং ছেলের বাপেরা যে নজির পড়েন, দুই-ই বাধ্য হয়ে, অর্থাৎ পেটের দায়ে। সেইজন্য সাহিত্যচর্চা দেশে একরকম নেই বললেই হয়; কেননা, সাহিত্য সাক্ষাৎভাবে উদরপূর্তির কাজে লাগে না। বাধ্য হয়ে বই পড়ায় আমরা এতটা অভ্যস্ত হয়েছি যে, কেউ স্বেচ্ছায় বই পড়লে আমরা তাকে নিষ্কর্মার দলেই ফেলে দিই; অথচ একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না, যে জিনিস স্বেচ্ছায় না করা যায়, তাতে মানুষের মনের সন্তোষ নেই। একমাত্র উদরপূর্তিতে মানুষের সম্পূর্ণ মনস্তুষ্টি হয় না। 

একথা আমরা সকলেই জানি যে, উদরের দাবি রক্ষা না করলে মানুষের দেহ বাঁচে না; কিন্তু একথা আমরা সকলেই মানিনে যে, মনের দাবি রক্ষা না করলে মানুষের আত্মা বাঁচে না। দেহরক্ষা অবশ্য সকলেরই কর্তব্য কিন্তু আত্মরক্ষাও অকর্তব্য নয়। মানবের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে যে মানুষের প্রাণ মনের সম্পর্ক যত হারায় ততই তা দুর্বল হয়ে পড়ে।

মনকে সজাগ ও সবল রাখতে না পারলে জাতির প্রাণ যথার্থ স্ফুর্তিলাভ করে না; তারপর যে জাতি যত নিরানন্দ সে জাতি তত নির্জীব। একমাত্র আনন্দের স্পর্শেই মানুষের মনপ্রাণ সজীব, সতেজ ও সরাগ হয়ে ওঠে। সুতরাং সাহিত্যচর্চার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, জাতির জীবনীশক্তির হ্রাস করা। অতএব, কোনো নীতির অনুসারেই তা কর্তব্য হতে পারে না। অর্থনীতিরও নয়, ধর্মনীতির নয়।

কাব্যামৃতে যে আমাদের অরুচি ধরেছে সে অবশ্য আমাদের দোষ নয়, আমাদের শিক্ষার দোষ। যার আনন্দ নেই সে নির্জীব একথা যেমন সত্য, যে নির্জীব তারও আনন্দ নেই, সে কথাও তেমনি সত্য। আমাদের শিক্ষাই আমাদের নির্জীব করেছে। জাতির আত্মরক্ষার জন্য এ শিক্ষার উলটো টান যে আমাদের টানতে হবে, এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। এই বিশ্বাসের বলেই আমি স্বেচ্ছায় সাহিত্যচর্চার সপক্ষে এত বাক্য ব্যয় করলুম। সে বাক্যে আপনাদের মনোরঞ্জন করতে সক্ষম হয়েছি কিনা জানিনে। সম্ভবত হইনি। কেননা, আমাদের দুরবস্থার কথা যখন স্মরণ করি, তখন খালি কোমল সুরে আলাপ করা আর চলে না; মনের আক্ষেপ প্রকাশ করতে মাঝে মাঝেই কড়ি লাগাতে হয়।

নির্বাচিত শব্দের অর্থ ও টীকা :

অব্যাহতি- মুক্তি। উত্তরোত্তর- ক্রমান্বয়ে; পরপর। উদ্গীরণ- বমিকরণ; ঢেকুর তোলা। উদরপূর্তি- পেট ভরানো। এথেন্স- গ্রিসের রাজধানী। কেতাবি- কেতাব অনুসরণ করে চলে যে বা যারা। কারদানি- বাহাদুরি। গতাসু- মৃত। গলাধঃকরণ- গিলে ফেলা। জগদ্বিখ্যাত- পৃথিবী বিখ্যাত; জগতের সর্বত্র প্রসিদ্ধ। জীর্ণ- হজম। ডেমোক্রেটিক- গণতান্ত্রিক। দাতাকর্ণ- মহাভারতের বিশিষ্ট চরিত্র; কুন্তিপুত্র; দানের জন্য প্রবাদতুল্য মানুষ। ধান ভানতে শিবের গীত- অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা। নিষ্পেষিত- সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ করা হয়েছে এমন। প্রত্যাখ্যান- উপেক্ষা; গ্রহণ না করা। বাজিকর- জাদুকর; ঐন্দ্রজালিক। বেয়াড়া- অভ্যাস ও ব্যবহার খারাপ এমন; একরোখা। মনন্তুষ্টি- মনের সন্তোষ; চিত্তের তৃপ্তি। মন্দাগতি- ধীর বা মন্থর গতি। যকৃত- কলিজা। রেজিস্টারি- সরকারি বইতে বা খাতায় নামাদি লিখন; নিবন্ধন। শাস্ত্রী- শাস্ত্রে বা যে কোনো বিশেষ বিদ্যায় পণ্ডিত; শাস্ত্রজ্ঞ। স্বচ্ছন্দ- নিজ ইচ্ছামতো; অনায়াস। স্ফূর্তিলাভ- উৎফুল্লতা।


সারসংক্ষেপ :

আমাদের স্কুল-কলেজে শিক্ষা গেলানোর চেষ্টা করা হয়। এতে প্রকত শিক্ষা হয় না। বরং প্রত্যেক মানুষের মধ্যে স্বশিক্ষিত হবার যে ক্ষমতা থাকে, তা নষ্ট হয়। শিক্ষার লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় পাশ করা আর অর্থ উপার্জন হতে পারে না। বহু মানুষের মনের বিকাশ জাতির যে মানসিক জাগরণ ঘটাতে পারে, জাতির উন্নতির জন্য তার মূল্য অনেক বেশি। এ কারণেই স্কুল-কলেজের চেয়ে লাইব্রেরি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাঁধা-ধরা শিক্ষা মনকে নির্জীব করে। অন্যদিকে, সাহিত্যচর্চায় মন সজীব ও সতেজ হয়। তাই নগদ প্রাপ্তি কম হলেও জাতীয় প্রগতির জন্য সাহিত্যচর্চার প্রসার দরকার।


সৃজনশীল প্রশ্ন-১

বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা নিতান্ত আবশ্যক, তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি। তেমনি কোনোমতে কাজ চলে মাত্র, কিন্তু মনের বিকাশ লাভ হয় না। হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারাদি রীতিমত হজম করিবার জন্য হাওয়া আবশ্যক।

ক. ‘বই পড়া’ প্রবন্ধটি প্রমথ চৌধুরীর কোন গ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে?

খ. ‘সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত।’ -কেন? বুঝিয়ে বলুন।

গ. উদ্দীপকটি ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের সঙ্গে কোন দিক দিয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ? -আলোচনা করুন।

ঘ. “উদ্দীপকটি ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের সমগ্র ভাব নয়, খণ্ডাংশকে ধারণ করেছে মাত্র।” -বিশ্লেষণ করুন।

সৃজনশীল প্রশ্ন-২

বই কেনার সামর্থ্য নেই। তবুও বিভিন্ন বন্ধুর নিকট থেকে বই সংগ্রহ করে পড়ে পায়েল। সাহিত্য, সাহিত্য সমালোচনা, আত্মজীবনী, দর্শন- জ্ঞানজগতের সকল প্রদেশে তার যাতায়াত থাকা চাই। অন্য দিকে তার বন্ধু কাকলি বই কিনে বন্ধুদের উপহার দেয় কিন্তু নিজে খুব একটা পড়ে না। তার ধারণা এসব বই পড়ে কী হবে? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ট।

ক. ‘বই পড়া’ প্রবন্ধ অনুসারে লেখকের মতে গ্রামে গ্রামে কী প্রতিষ্ঠা করা উচিত?

খ. ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক লাইব্রেরিকে হাসপাতালের সঙ্গে তুলনা করেছেন কেন?

গ. উদ্দীপকে ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের কোন দিকটি প্রকাশিত হয়েছে?-আলোচনা করুন।

ঘ. “উদ্দীপকের পায়েল ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের একটি বিশেষ চিন্তার ধারক।” -মন্তব্যটি বিচার করুন। 


নমুনা উত্তর : সৃজনশীল প্রশ্ন

সৃজনশীল প্রশ্ন-১ এর নমুনা উত্তর :

ক. ‘বই পড়া’ প্রবন্ধটি প্রমথ চৌধুরীর ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

খ. ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে লেখক বিশ্বাস করেন শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে নাÑএজন্য তিনি উক্তিটি করেছেন।  পৃথিবীতে বস্তুগত ও ভাবগত সকল বিষয়েরই আদান-প্রদান প্রথা প্রচলিত আছে। তবে শিক্ষা এমন একটি ব্যাপার যা কখনো বিনিময় করা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষক বড়জোর শিষ্যের আত্মাকে উদ্বোধিত করতে পারেন, কিন্তু শিক্ষিত করে তুলতে পারেন না। এটা নিজ¯^ চর্চা এবং অভ্যাসের মাধ্যমে আয়ত্ত করে নিতে হয়। একারণেই প্রাবন্ধিক মন্তব্যটি করেছেন। 

গ. শিক্ষাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়Ñ ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের এই বিষয়টি উদ্দীপকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।  মানুষের মানব সত্তা বিকাশের জন্য বই পড়া অপরিহার্য। বই মানুষের মানব সত্তা বিকাশে সহায়ক। বই পড়লে মানুষ শিক্ষিত হয়। এ জন্য শিক্ষাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। আর এই শিক্ষা নিজের চেষ্টাতেই অর্জন করতে হয়। অন্য কথায় বলা যায়, সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত।  উদ্দীপকে বলা হয়েছে বাল্যকাল হতে আমাদের শিক্ষার সঙ্গে আনন্দের সংযোগ নেই। আমরা কেবল যেটুকু আমাদের নিতান্ত প্রয়োজন সেটুকুই কণ্ঠস্থ করি। এতে আমাদের কোনোমতে কাজ চলে যায় মাত্র। তাতে কোনোক্রমেই মনের বিকাশ সাধিত হয় না। শিক্ষাকে রীতিমত হজম করতে হলে অনেক অপাঠ্য পুস্তককে পাঠ্য পুস্তকের সঙ্গে হজম করতে হয়। ‘বই পড়া’ প্রবন্ধেও প্রাবন্ধিক পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে অ-পাঠ্যপুস্তক পড়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। আমরা জাতি হিসাবে সৌখিন নই বলে শখ করে কেউ বই পড়ি না। ফলে আমরা শিক্ষার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাই না। আমাদের অভিভাবকগণ ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন। তাদের ধারণা বিদ্যাপীঠ থেকে ছেলে-মেয়েরা এমন পরিমাণ বিদ্যা অর্জন করবে যাতে ভাবীকালের সময়টা ভালোভাবেই কেটে যাবে।

ঘ. উদ্দীপকটি ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের সামগ্রিক ভাবকে ধারণ করে না।  শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। একটি সভ্য ও শিক্ষিত জাতির ভিত নির্ভর করে তার উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার উপর। তাই আমাদের প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এই শিক্ষা অর্জিত হবে আনন্দের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের বই গিলিয়ে নয়।  ‘বইপড়া’ প্রবন্ধে লেখক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, জোর করে কাউকে শিক্ষিত করা যায় না। সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত। শিক্ষা মানুষকে অর্জন করতে হয় আনন্দের সঙ্গে। স্বশিক্ষিত হওয়ার জন্য মানুষকে পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে অনেক পাঠ্য-বহির্ভূত পুস্তকও পড়তে হয়। কিন্তু আমরা শিক্ষার ফলটা হাতে হাতে পেতে চাই। আমরা ধারণা করি বিদ্যাপীঠে পাঠিয়েই শিক্ষার্থীদের বিদ্যা অর্জন সারা হয়ে গেল। এই বিদ্যার জোরেই তারা বাকিটা জীবন আরাম-আয়াসে কাটিয়ে দিতে পারবে। উদ্দীপকেও বলা হয়েছে, আমাদের শিক্ষার সঙ্গে আনন্দ নেই যদিও বাল্যকাল হতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করে থাকি। কেননা শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করি। এতে কোনোমতে কাজ চলে মাত্র কিন্তু ব্যক্তির মানসিক বিকাশ সাধিত হয় না। উদ্দীপকে আরো বলা হয়েছে হাওয়া খেলে মানুষের পেট ভরে না কিন্তু খাবারকে হজম করার জন্য হাওয়ার প্রয়োজন।

শিক্ষা মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ। মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশের জন্য শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ না করলে শিক্ষা সার্থক হয় না। এই বিষয়টি ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে লেখক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। আর উদ্দীপকে বিষয়টিকে সংক্ষিপ্তরূপে তুলে ধরা হয়েছে। অতএব, বলা যায় উদ্দীপকটি ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের সমগ্র ভাবকে ধারণ করেনি, খণ্ডিত অংশকে তুলে ধরেছে মাত্র। 


অ্যাসাইনমেন্ট : নিজে করুন

সৃজনশীল প্রশ্ন :

মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিত তবে সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই মহাশব্দের সহিত এই লাইব্রেরীর তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃক্সখলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়াছে।

ক. প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সাময়িকপত্রের নাম কী?

খ. ‘এ আশা সম্ভবত দুরাশা।’ -কেন?

গ. উদ্দীপকে ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের যে দিকটি প্রকাশিত হয়েছে তা বর্ণনা করুন।

ঘ. ‘উদ্দীপকের বিষয়বস্তু ‘বই পড়া’ প্রবন্ধের সমগ্র ভাবকে ধারণ করে না।’ -মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করুন।

 

Post a Comment

0 Comments